হাইল হাওরের ওপর নির্ভরশীল ২৫ হাজার মানুষ

মার্চ ৫, ২০১৩, ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ 👉 এই সংবাদটি ৬১ বার পড়া হয়েছে

Hour01-040313-01jurinewsমৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার তিন উপজেলা শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার সদর ও বাহুবল
উপজেলার কিয়দংশ নিয়ে অবস্থিত সুবিশাল হাইল হাওর। সরকারি খাস ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি মিলিয়ে বর্ষা মৌসুমে মৌলভীবাজারের কালিয়ারগাঁও থেকে শ্রীমঙ্গলের মতিগঞ্জ পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১১ কিলোমিটার প্রস্তের হাইল হাওরের শুষ্ক মৌসুমে দৈর্ঘ্য থাকে ১০ কিলোমিটার ও প্রস্ত থাকে ৫ কিলোমিটার। বর্ষা মৌসুমে সুবিশাল জলরাশির হাইল হাওরে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে তিন শতাধিক বিল। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার সামান্য অংশ হাইল হাওরে থাকলে মূলত হাওরটি শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর নামেই পরিচিত। এ হাইল হাওরে প্রতি বছর গড়ে ৬ থেকে ৭ শত টন মাছ উৎপন্ন হয়। এ হাওরের মাছ এলাকার চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানী করা হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এছাড়া এ হাওরের মাখনা, ভেট ইত্যাদি ফল বিক্রি হয় বাজারে। হাওরে রয়েছে ২ শতাধিক মৎস্য ফিসারী, ৪০টি হাঁসের খামার, ১৫টি গরু-মহিষের বাথান।

হাইল হাওরের ইতিহাসঃ ১৮২৪ সালে সিলেট অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। এ ভূমিকম্পে সিলেটের সর্বত্র ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মারা যায় হাজার-হাজার মানুষ। ভূমিকম্পে পরিবর্তিত হয় সিলেটের ভূ-অবস্থান। ভূমিকম্পের কারনে শ্রীমঙ্গলের মতিগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজারের কালিয়ারগাঁও পর্যন্ত নিন্মাঞ্চল ডেবে গিয়ে সৃষ্টি হয় হাইল হাওরের-এ তথ্য জানিয়েছেন পরিবেশবিদ সিতেশ রঞ্জন দেব। কালের পরিক্রমায় ক্রমান্বয়ে হাইল হাওর এ অঞ্চলের হাজার-হাজার মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠে। বর্তমানে হাইল হাওর পাড়ের বরুনা, নয়নশ্রী, কালিয়ারগাঁও, মির্জাপুর, ভূনবীর, রুস্তমপুর, দিগাপাড়া, মতিগঞ্জ, গ্রাম শ্রীমঙ্গল, লালবাগ, পশ্চিম ভাড়াউড়া, মিরনগর প্রভৃতি গ্রামের ৪ হাজার পরিবারের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ হাইল হাওরের ওপর নির্ভরশীল। উপরোক্ত গ্রামগুলোতে বসবাস করছে মুসলিম মৎস্যজীবি, সনাতন (হিন্দু) নমসুদ্র ও পাটনা সম্প্রদায়ের লোকজন। গ্রামগুলোর প্রায় ১৬ হাজার লোক মাছ আহরনের সাথে জড়িত। বাকিরা হাওর কেন্দ্রীক অন্যান্য পেশায় যুক্ত।

পুরো হাওর জুড়ে মাছের মেলাঃ সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন মিলিয়ে হাইল হাওরে প্রায় ৩ শতাধিক বিল রয়েছে। এছাড়া মৎস্য ফিসারী রয়েছে ২ শতাধিক। এ এলাকার প্রধান মৎস্য ভান্ডার হিসেবে হাইল হাওর সুপ্রসিদ্ধ। রয়েছে মাছের অভয়াশ্রমও। বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মাছের প্রজনন ও অভয়াশ্রম রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। সিলেট অঞ্চলের বাজারগুলোতে হাইল হাওরের মাছের আলাদা কদর রয়েছে। অন্য এলাকার মাছের চেয়ে অধিক মূল্যে এ হাওরের মাছ বিক্রি হয়। মৎস্যজীবিরা জানান, শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরটি বাহুবলের গোপলা নদী হয়ে নবীগঞ্জের বিজনা নদীতে মিশেছে। আর বিজনা নদী মিশেছে কুশিয়ারা নদীর মোহনায়। ফলে কুশিয়ারা নদীর বড় বড় মাছও কালে ভদ্রে হাইল হাওরে পাওয়া যায়। এলাকার প্রায় ১৬ হাজার মৎস্যজীবি মৌসুমে হাইল হাওরের মাছ ও শুষ্ক মৌসুমে হাওর পাড়ে ধানের চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। অনেকে অভিযোগ করেন, শুষ্ক মৌসুমে হাওরের পানি শুকিয়ে গেলে হাওরটি ছোট হয়ে যায়। সে সময় হাওরের জমি দখল করে প্রভাবশালী মহল ধান চাষ করে। এছাড়া ‘জাল যার জলাশয় তার’ এ নীতি মানেন না এলাকার অনেকেই। প্রকৃত মৎস্যজীবিদের বাদ দিয়ে বিলগুলোর অধিকাংশই লীজ দেয়া হয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের অনুকুলে।

Hour02-040313-02jurinewsহাইল হাওরের ঘাস, সমৃদ্ধি বারো মাসঃ  হাইল হাওরের চর্তুপাশে রয়েছে ১৫টি গরু-মহিষের বাথান। এছাড়া এলাকার সহস্রাধিক রাখাল হাওর পাড়ে গরু-মহিষ চড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। হাইল হাওরের ঘাস এ অঞ্চলের উৎকৃষ্ট গো-খাদ্য। এলাকায় জনস্রোতি রয়েছে হাইল হাওরের ঘাস খাওয়ালে গরু-মহিষের স্বাভাবিকের তুলনায় দেড়গুন বেশি দুধ পাওয়া যায়। এলাকার শতাধিক মানুষ প্রতিদিন হাইল হাওরের ঘাস কেটে এনে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করতে দেখা যায়। বারো মাসই হাইল হাওরে ঘাস পাওয়া যায়। ফলে এলাকার গরু-মহিষ বাথানের মালিক, রাখাল ও ঘাস বিক্রেতারা মনে করেন ‘হাইল হাওরের ঘাস, সমৃদ্ধি বারো মাস’।

ঋতু বদল হলে বদলে যায় পেশাঃ  হাইল হাওর পাড়ের মানুষ ঋতু বদলের সাথে সাথে নানা পেশায় জড়িয়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে যারা মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা শুষ্ক মৌসুমে ধান চাষ, হাঁস-মোরগের খামার করেন। বিকল্প পেশার ব্যবস্থা না থাকলে বছরের ৬ মাস না খেয়ে থাকতে হবে এমন মন্তব্য করেন হাইল হাওর পাড়ের মির্জাপুর গ্রামের মৎস্যজীবি মোঃ ফরিদ মিয়া। তিনি বলেন, হাইল হাওরে সারা বছরই মাছ পাওয়া যায়। তবে শুষ্ক মৌসুমে মাছের প্রজনন না হবার কারনে মাছের চেয়ে মৎস্যজীবির সংখ্যা বেশি পরিলক্ষিত হয়। এ কারনে তিনি এবং তার মতো অনেকেই হাওর কেন্দ্রীয় অন্য পেশায় ঝুকে পড়েন। কেউ ধান রোপন করেন, কেউ হাইল হাওরে আসা পর্যটকদের গাইড হিসেবে কাজ করেন, কেউ হাওরে নৌকা চালান, কেউবা পদ্মটোনা, ভেট, মাখনা তুলেন, কেউবা গরু পালন করেন।

হাওরের পদ্মটোনা, মাখনা ও ভেট বিক্রি করে স্বাবলম্বি মনিরাঃ  হাইল হাওর পাড়ের বরুনা (হাজীপুর) গ্রামের গৃহবধু মনিরা বিবি। মৎস্যজীবি স্বামী মারা যান ১৯৮৯ সালে। যখন স্বামী মারা যান তখন মনিরা ২২ বছরের তরুনী। বিয়ের মাত্র ৬ বছরের মাথায় বিধবাত্ব বরণ করে মনিরা চোখে অন্ধকার দেখেন। এর মধ্যে শ্বশুর বাড়ির চরম অবহেলা তাকে করে তুলে আত্মপ্রত্যয়ী। অন্যের গলগ্রহ না হয়ে শোককে শক্তিতে পরিণত করে মনিরা জীবনযুদ্ধের বৈতরনী পাড়ি দেবার প্রয়াসে হাওরে পদ্মটোনা, মাখনা, ভেট আহরন শুরু করেন। অল্প দিনেই তিনি সাবলম্বি হয়ে ওঠেন। প্রতি বছরের অক্টোবর মাস থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত পদ্মটোনা আহরন করেন। বাকি সময় মাখনা ও ভেট তার সংসারের চাকা রেখেছে সচল।

ঐতিহ্য হারাচ্ছে হাইল হাওরঃ হাইল হাওর পাড়ের বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর পূর্বেও হাইল হাওরে দেশীয় প্রজাতির মাছের অধিক্য ছিলো। কিন্তু অবাধে মাছ আহরন, মা মাছ শিকার ইত্যাদি কারনে বর্তমানে হাইল হাওর থেকে হারিয়ে গেছে ৩৭ প্রকারের দেশীয় মাছ। এসব মাছ রক্ষায় কারো কোন মাথা ব্যথা নেই। এছাড়া মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে ৬২টি চা বাগান। এসব বাগানে পোকা মাকর ধ্বংশে কীটনাশক স্প্রে করা হয়। বর্ষা মৌসুমে চা বাগানগুলোকে স্প্রে করা কীটনাশক বৃষ্টির পানিতে হাইল হাওরে গিয়ে পড়ে। ফলে বিষাক্ত কীটনাশকের তেজস্ক্রিয়তায় অনেক মাছ ধ্বংশ হচ্ছে। মৎস্যজীবিরা জানান, ইতোমধ্যে হাইল হাওরের বাইক্কা বিলকে মৎস্য ও পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষনা করা হয়েছে। সরকার পুরো হাইল হাওরকে মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষনা দিয়ে কাজ করলে হাইল হাওর তার পুরানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে, ঘুচবে সিলেট অঞ্চলের মাছের সংকট।

 ::এম. মছব্বির আলী::জুড়ী নিউজ::

loading...
error: এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা আংশিক নকল করে বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি