বিবর্ণ হাকালুকি

ডিসেম্বর ৭, ২০১৭, ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ 👉 এই সংবাদটি ১০৪ বার পড়া হয়েছে

Loading...

সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশ নদী-নালা ও হাওর-বাওর ঘেরা। হিজল-তমাল বট-জারুলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে অন্যতম কারণ এদেশের জলাভূমিগুলো। তার মধ্যে হাকালুকি হাওর অন্যতম। এটি এশিয়ার বৃহত্তম জলাভূমির একটি। এর জীব বৈচিত্রের কারণে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালের এপ্রিল মাসে একে “ঊপড়ষড়মরপধষষু ঈৎরঃরপধষ অৎবধ” হিসেবে ঘোষনা দিয়েছে। হাকালুকি হাওর মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলা এবং সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলার মধ্যে বিস্তৃত। এর বিস্তৃতি শুষ্ক মৌসুমে ১৮ হাজার ৩০ হেক্টর এবং বর্ষা মৌসুমে ৩৯ হাজার ৩শত ২২ হেক্টর। হাকালুকি হাওরে ছোট, মাঝারী ও বড় বিলের সংখ্যা ২শত ৭৬টি। বৈচিত্রময় জীববৈচিত্র ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য এই হাওরটি অতি পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার জন্য এর জীববৈচিত্র হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

হাকালুকি হাওরের পানি সাধারণত অক্টোবরের দিকে শুকিয়ে যায়। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর হাকালুকি হাওর উর্বর ফসলের ক্ষেতে রুপান্তরিত হয়। কিন্তু এই বৎসরের বন্যার কারণে অক্টোবর পেরিয়ে নভেম্বর চলে এলেও এর পানি শুকায়নি। ২০১৭ সালের বন্যায় হাকালুকি হাওরের আশপাশের গ্রাম ও ধানক্ষেতগুলো বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে গিয়েছিলো। হাকালুকির বৈচিত্রময় বাস্তুতন্ত্রে রয়েছে প্রায় ৭৩ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, ১০৭ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ, ২৩ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫ প্রজাতির উভচর এবং ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ীর আবাস। বন্যার পানিতে ধানক্ষেতগুলো প্লাবিত হয়ে যাওয়ায় ধান গাছগুলো পঁচে পানিতে মিশে গিয়েছিলো। পঁচাধান গাছগুলো থেকে সৃষ্ট গ্যাস পুরো হাকালুকি হাওরের পানিতে ও বায়ুতে মিশে গিয়েছিলো। যার ফলে মারা গেছে হাওরের বিপুল সংখ্যক মাছ, সরীসৃপ, উভচর ও জলজ উদ্ভিদ। পঁচা ধান গাছের দুর্গন্ধে অতিষ্ট হয়ে পড়েছিলো আশপাশের মানুষ। এই বন্যায় হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে অনেকখানি।

হাকালুকি হাওরের ছোট-বড় অনেক বিল রয়েছে। জুড়ী নদী, সোনাই নদী, ফানাই নদীসহ আশপাশের নদীগুলোর পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে হাকালুকি হাওরের বিলগুলো। বড় বিলগুলোতে পলি মাটি জমে গভীরতা কমে যাচ্ছে। হাকালুকি হাওরের বড় বড় বিল চাতলা, পিংলা, হাওর খাল, জলা, চকিয়া ইত্যাদিসহ অধিকাংশ বিল হচ্ছে মাছের আবাসস্থল। শীতকালে এই বিলগুলো মা মাছদের আশ্রয় কেন্দ্র। কিন্তু পলি জমে বিলগুলো ভরাট হওয়ায় মাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বহু প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এসে দাড়িয়েছে। এসব বিলেরর গভীরতা কমে যাওয়ার ফলে বন্যার পানিতে হাওর সংলগ্ন এলাকা ভেসে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

হাকালুকি হাওরের বন্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে হাওর থেকে পানি কুশিয়ারা নদীতে দ্রুত যেতে না পারা। পূর্ব হাকালুকি হাওরে বন্যা হলে অতিরিক্তি পানি সহজে ও দ্রুত কুশিয়ারা নদীতে গিয়ে পড়তো। কিন্তু কুশিয়ারা নদী ও হাকালুকি হাওরের মিলন স্থলে বুড়িকুয়ারি বিলের মধ্যে বাঁধনির্মাণ করায় এখন আর কুশিয়ারা নদীতে পানি দ্রুত গতিতে যেতে পারছে না। এছাড়া খননের অভাবে কুশিয়ারা নদীও নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে হাকালুকি হাওর থেকে পানি প্রবাহমান স্রোতধারায় দ্রুত বেগে বেরিয়ে যেতে না পারায় পানি ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে আশপাশের অঞ্চল প্লাবিত হয়ে যায়।

শীতকালে অতিথি পাখির আগমন হাকালুকি হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভিন্নমাত্রা যোগ করে। দেশী পাখির বিচরণ ছাড়াও প্রতি বছর শীতকালে প্রায় ১শত ৫০ প্রজাতির অতিথি পাখি সাইবেরিয়া ও অন্যান্য শীতপ্রধান অঞ্চল থেকে এখানে আসে। কিন্তু বেআইনীভাবে পাখি শিকার করার ফলে এখন অতিথি পাখির আগমনও কমে যাচ্ছে।

অনেক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে হাকালুকি হাওরকে ঘিরে। ধান উৎপাদন, গরু-মহিষ পালন, নলখাগড়া ও ঘাস সংগ্রহ করণ, জলজ ও অন্যান্য উদ্ভিদ আহরণ, মৎস শিকার এবং সবজি চাষের মাধ্যে অনেকে জীবন অতিবাহিত করে। চারন ভূমি হিসেবে হাকালুকি হাওর ব্যবহৃত হয়।

এপ্রিল-মে মাসে বন্যার প্রকোপ থেকে হাকালুকি হাওর নিম্ন এলাকাকে রক্ষা করতো। কিন্তু এখন পলি জমে হাকালুকি হাওর ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে হাকালুকি হাওরের পানিতেই নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে যাচ্ছে।

তাই হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য শিঘ্রই সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে। জুড়ী নদী খনন করা উচিত যাতে নদী আবার হারানো নাব্যতা ফিরে পায়। যে সব বিলে পলি জমে গেছে সে গুলোতেও খননের কাজ করতে হবে। হাওরে অবাধে মৎস ও পাখি শিক্ষার করতে হবে। বুড়িকুয়ারি বিলের বাঁধ ভেঙ্গে ফেলতে হবে যাতে হাকালুকির পানি কুশিয়ারা নদীতে দ্রুত গতিতে নেমে যেতে পারে। কুশিয়ারা নদীর নাব্যতা ফিরে পাওয়ার জন্য নদীতে খনন করতে হবে। জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে এখনি কাজ শুরু করতে হবে। অন্যথায় পৃথিবীর অন্যতম জলাশয়ের জীববৈচিত্র হারিয়ে যেতে সময় লাগবে না।

পারিজাত চন্দ্রাননা অর্চি
একাদশ, বিজ্ঞান
টিএন খানম একাডেমি ডিগ্রি কলেজ
জুড়ী, মৌলভীবাজার।

loading...
error: এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা আংশিক নকল করে বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি