কমলগঞ্জের কেওলার হাওরে আড়াইশ হেক্টর অনাবাদি জমিতে ধানের আবাদ ॥ কৃষকের মূখে হাসির ঝিঁলিক

ফেব্রুয়ারী ১, ২০১৮, ৪:৫৫ অপরাহ্ণ 👉 এই সংবাদটি ১০৪ বার পড়া হয়েছে

সৈয়দ ছায়েদ আহমদ: নব দিগন্তের সুচনা হয়েছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কেওলার হাওরে। এতদিন শুকনো মৌসুমে এই হাওরে যে জমিগুলো আনাবাদি পড়ে থাকতো চলতি বোর মৌসুমে সেই অনাবাদি জমিতে এলাকার কৃষকরা ধানের আবাদ করেছেন। আর সেই ধান পাকার পর কেটে গোলায় তুলবেন, দুর হবে তাদের এত দিনকার দু:খ কষ্ট। এমনই বুক ভরা স্বপ্ন দেখছেন হাওর পাড়ের মানুষেরা। আজ যেন তাদের আনন্দের আর শেষ নেই।
গত সোমবার দুপুরে সরেজমিন গিয়ে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজার, পতনউষার, শমশেরনগর ও আলীনগর ইউনিয়ন নিয়ে এই হাওরের অবস্থান। এই চারটি ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রামে প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের বসবাস। চারটি ইউনিয়নের প্রায় ৯০০ হেক্টর ফসলী জমির এই কেওলার হাওর। এক সময় কেওলার হাওরে আউশ, আমন আর বোর ফসল ফলানো হতো। কিন্তু পানি নিষ্কাশন আর যাতায়াতের সুবিধা না থাকায় গত দশ বছর ধরে হাওরের অর্ধেক ফসলি জমি কৃষকরা পতিত ফেলে রাখেন। কারণ কষ্ট করে ফলানো ফসল তারা ঘরে তুলতে পারেন না। বর্ষার পানিতে সেই ফসল তলিয়ে যায়। এতে করে কৃষকরা শ্রম ও আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হন। মূলত: এ দুটি কারনেই কেওলার হাওরে জমিকে ধান চাষ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন ওই এলাকার কৃষকরা।
তবে চলতি বোর মৌসুমের আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক চিফ হুইপ আলহাজ্ব উপাধ্যক্ষ মো: আব্দুস শহীদ কৃষকদের এই দু:খ লাঘবের জন্য কেওলার হাওর উন্নয়নে তাঁর ব্যক্তিগত প্রচেষ্ঠা চালিয়ে হাওরের বুক চিরে যাওয়া উপশি ও খাইজান খালটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩৫০০ ফুট ও প্রস্থে ১৫ ফুট পূন:খনন করা হয়। আর কেওলার হাওরের রুপসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে র্প্বূ দিকে লাঘাটা ছড়ার পাড় পর্যন্ত ২০০০ ফুট রাস্তা পূন: সংস্কার করা হয়। এতে হাওরে পতিত জমিগুলো চাষ উপোযোগী হয়ে উঠে।
সরজমিনে কেওলার হাওরে গিয়ে আরো দেখা যায়, কৃষকরা মনের আনন্দে হাওরে জমি চাষ দিচ্ছেন। কেউবা চাষকৃত জমিতে ধানের চারা রোপন করছেন। কেউ কেউ ব্যস্ত রয়েছেন বীজতলা থেকে চারা উত্তোলনের কাজে। এক সময় ফেলে রাখা হাওরের পতিত জমি সবুজ ধান গাছে ভরে উঠছে। কেবল স্থানীয় এমপির একটু উদ্যোগ আর প্রচেষ্ঠাই বদলে দিয়েছে কেওলার হাওরের এই চিত্র। বিস্তীর্ণ হাওরের মাঠ জুড়ে এখন শুধু সম্ভাবনার হাত ছানি। স্থানীয় কৃষক মাসুক মিয়া, আবুল বশর জিল্লুল, জুবায়ের আহম্মেদ, শামিম আহম্মেদ, মৌরাজ মিয়া, সিপার মিয়া, আব্দুর হান্নান জানান, এতো দিন তাদের জমি পতিত ফেলে রাখতেন। কিন্তু এখন তারা আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। চলতি বোর মৌসুমে তাদের সবাই হাওরে পতিত জমিতে ধান চাষ করেছেন। আর এটা সম্ভব হয়েছে হাওরে পানি নিষ্কাশন আর যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দেয়ায়। এখন তারা অনায়াসেই ঠেলায় করে সার, বীজ নিয়ে হাওরের শেষ সীমানা পর্যন্ত যেতে পারবেন। এখন লাঘাটা ছড়ায় এলাকার কৃষকদের দাবী সুইচ গেইট নির্র্মানের। একই সাথে বনবিষ্ণুপুর, রামেশ্বরপুর, ধুপাটিলা, কুদালিছড়া, রায়নগরের ঘনিয়ামারা ও খোদিজান ছড়া, মইদাইল ও ভুমিগ্রামের মান্দারছড়া, বাসুদেবপুরের ভাওরকোনা বিল খননেরও দাবি করে বলেন, তা না হলে পাহাড়ী ঢলে উজান থেকে আসা ছড়ার পানির সাথে পলি মাটি এসে কেওলার হাওর ভরাট হয়ে যাবে।
এর আগে শনিবার কেওলার হাওর দেখতে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ, কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হক,কমলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এম, মোসাদ্দেক আহমদ মানিক, কমলগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো: আব্দুল মোকতাদির পিপিএম, পতনউষার ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার তওফিক আহমদ বাবু, মুন্সীবাজার ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালিব তরফদার, প্যানেল চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান, যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ইসলাম ইমন, স্থানীয় ইউপি সদস্য, কৃষক, সাংবাদিক। সেখানে এমপি ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ হাওরপাড়ের কৃষকদের সাথে তাদের সমস্যা নিয়ে মতবিনিময় করেন।
মুন্সিবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালিব তরফদার এবং পরিষদের সদস্য মো. শফিকুর রহমান বলেন, কেওরার হাওর উন্নয়ন এলাকাবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল। আজ কেওলার হাওরে প্রাণ ফিরে এসছে। কৃষকরা ধান চাষ করছে। এতে শুধু কৃষকরাই লাভবান হবে না এখানে উৎপাদিত ফসল দেশের কৃষির উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সামছুউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, পানি নিস্কাশনের সুষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় এই হাওরে আড়াইশ হেক্টর জমি আনাবাদি থেকে যেত। ওই জমিতে এখন থেকে বছরে প্রায় দুই হাজার মেট্রিকটন ধান উৎপন্ন হবে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, খাল খননের ফলে হাওরে কৃষির সাথে সাথে মৎস্য সম্পদেরও উন্নয়নে নব দিগন্তের সূচনা হবে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন, খালটি খননের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এলাকাবাসীর। এলাকার এমপি মহোদয়ের প্রচেষ্টায় খালটি খনন করা হচ্ছে। কাজও প্রায় শেষ পর্যয়ে রয়েছে। খালটি খননের ফলে হাওরের প্রায় ২৮৬ হেক্টর জমি এখন চাষাবাদ করা যাবে। খালে পানি থাকায় এই হাওরে এখন তিনটি ফসলেরই আবাদ হবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক চিফ হুইপ আলহাজ্ব উপাধ্যক্ষ মো: আব্দুস শহীদ বলেন, দেশে কৃষি জমি বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দেশনার আলোকেই আমি এলাকায় কাজ করে যাচ্ছি। তাছাড়া এই খালটি খনন করা এলাকার কৃষকদের প্রাণের দাবি ছিল। খালটি খননের ফলে এই হাওরে এখন মানুষ সারা বছরই তিনটি ফসল ফলাতে পারবে। কৃষকদের উন্নয়নে সরব ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

loading...
error: এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা আংশিক নকল করে বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি