হাকালুকি হাওরে নির্বিচারে চলছে অতিথি পাখি নিধন

ফেব্রুয়ারী ১১, ২০১৮, ১:৩১ অপরাহ্ণ 👉 এই সংবাদটি ১০৪ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি: এশিয়ার বৃহত্তম হাওর ও দেশের সর্ববৃহৎ অতিথি পাখির সমাগমস্থল হাকালুকি হাওরে নির্বিচারে চলছে বিষটোপে ও ফাঁদ পেতে পাখি শিকার। ফলে দিন দিন হাওরে আসা অতিথি পাখির সংখ্যা কমছে। একসময় পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হতো হাকালুকি হাওরকে। বৈশি^ক পরিবর্তণের পাশাপাশি হাওরে কোন সরকারি বেসরকারি প্রকল্প নেই। সেই সাথে শিকারি চক্রের অপতৎপরতার কারণে দিন দিন অতিথি পাখির সংখ্যা কমছে বলে পাখি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
৯ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার হাকালুকি হাওর পরিদর্শণে গেলে হাওরের বিভিন্ন বিলে মৃত অতিথি পাখি পড়ে থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে টোলার বিলে অসংখ্য মরা পাখির দেখা মিলে। মরা পাখি দেখে স্থানীয় লোকজনের ধারণা পাখিগুলো বিষটোপে মারা হয়েছে। মরা পাখিগুলোর বেশির ভাগই বেগুনী কালেম ও লেঞ্জা বলে জানান বন্য প্রাণি বিশেষজ্ঞ বশির আহমেদ। তবে বিষটোপে না ফাঁদে আটকা পড়ে মারা গেছে সেটা ময়নাতদন্ত ছাড়া প্রমাণ করা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান। হাকালুকি হাওরে বন্যপ্রাণির অবাধ বিচরণ ও নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে রয়েছে দুটি বিট অফিস। কিন্তু দুটি অফিসে মাত্র ২জন কর্মচারি কর্মরত আছেন। তাছাড়া পরিবেশ অধিদফতর হাওর উন্নয়নে কাজ করছে। সেটা যেন কাগজে কলমে। কেউই পাখি নিধনের দায় নিতে চায় না। আর সেই সুযোগে শিকারিচক্র অনেকটা বেপরোয়া।
বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক জানান, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও বেসরকারি সংস্থা সিএনআরএসের ক্রেল প্রকল্পের যৌথ উদ্যোগে হাকালুকি হাওরে দু’দিন ব্যাপী জলচর পাখি শুমারি অনুষ্ঠিত হয়। পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক আরও জানান, এবার হাওরে ৪৪ প্রজাতির ৪৫ হাজার ১০০ পাখি হাকালুকি হাওরে বিচরণ করতে দেখা গেছে। এরমধ্যে হাওরখাল বিলে ১৫ হাজার ৭৩৫টি পাখি গণনা করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির পাখিদের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে পিয়ং হাঁস (গ্যাডওয়াল) ৫ হাজার ৬৭৫টি। সরকার ১৯৯৯ সালে হাকালুকি হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ২০০২ সাল থেকে হাওর উন্নয়নে পরিবেশ অধিদফতরসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা হাওরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে।

পরিবেশ অধিদফতরের তত্বাবধানে ২০০৪ সাল থেকে হাকালুকি হাওরের জলচর পাখি শুমারির কাজ শুরু হয়। হাকালুকি হাওরের প্রায় প্রতি বছর ৬০ থেকে ৬৫ প্রজাতির সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩০ হাজার পর্যন্ত অতিথি পাখি গণনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ গত কয়েক বছর থেকে পাখির সংখ্যা কমতে শুরু করে। পাখি শুমারিকালে হাকালুকি হাওরে বেয়ারের ভুতিহাঁস, মরচে রঙয়ের ভুতিহাঁস, পাতারি ফুটকি, দাগি রাজহাঁসের মত বিলুপ্ত প্রজাতির অতিথি পাখির দেখা মিলতো। এর সংখ্যাও কমতে থাকে। চলতি জলচর পাখি শুমারিকালে কোন বিলুপ্ত প্রজাতির পাখির দেখা মেলেনি দেশের সর্ববৃহৎ এই পাখির সমাগমস্থলে। পাখি ও বন্য প্রাণি বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশি^ক প্রভাবে যেমন হাকালুকি হাওরে অকাল ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, নির্দিষ্ট সময়ে শীতের প্রভাব কম থাকা সব মিলিয়ে জলবায়ুর যে পরিবর্তণ অতিথি পাখি কম আসার পেছনে এটি একটি অন্যতম কারণ। তাছাড়া বিষটোপ ও ফাঁদ পেতে পাখি শিকার বন্ধ না হওয়ার ফলে তুলনামুলক পাখি কম আসছে। পাখির আবাসস্থল যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে পাখির সেখানে আসাটা কমে যাবে। কুলাউড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ জানান, অতিথি পাখি কম আসা মানে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া। ফলে মাছ আর পাখির জন্য যত বেশি অভয়াশ্রম হবে তাতে পাখির সমাগম বৃদ্ধি পাবে। পাখির সমাগম বৃদ্ধি পেলে মাছের উৎপাদন বাড়বে। তাতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে হাওরের উপর জীবিকা নির্বাহকারী মানুষ।
বন্যপ্রাণি ও জীববৈচিত্র্য বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মিহির কুমার দো জানান, তিনি ১০ ফেব্রুয়ারি শনিবার হাকালুকি হাওরের নাগুয়া, লরিবাই ও হারাম ডিঙ্গা বিলে রয়েছেন। এসব বিলে মরা কোন অতিথি পাখি দেখতে পাননি। পাখি নিধন রোধ করতে হলে স্থানীয় জনগণকেই এগিয়ে আসতে হবে। এমনিতে হাওর দুর্গম ও বিশাল এলাকা। ২ জন প্রহরি কেন ১০-২০ জন দিয়েও এত বিশাল এলাকায় পাখির বিচরণ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

loading...
error: এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা আংশিক নকল করে বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
%d bloggers like this: