হুমকির মুখে মনুনদীর দু’তীর মৌলভীবাজারে অবৈধ বালু উত্তোলনের হিড়িক

ফেব্রুয়ারী ১৩, ২০১৮, ৪:৪৫ অপরাহ্ণ 👉 এই সংবাদটি ১৩৮ বার পড়া হয়েছে

ইমাদ উদ দীন: অবাধে চলছে বালু উত্তোলন। দিনদুপুরে দেদারছে চলছে এই অবৈধ কর্মযজ্ঞ। জেলার শতাধিক স্পটে অবৈধ ভাবে এখন এমন হিড়িক চলছে বালু উত্তোলনের। অপরিকল্পিত ভাবে বালু উত্তোলনে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে নদী। ঝুঁকিতে পড়ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। আর নদী ভাঙ্গনের হুমকিতে রয়েছেন তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা। কিন্তু এমন বেআইনি কর্মযজ্ঞ থামাতে দেখার নেই কেউ। এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। সংশিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা বলছেন দ্র”ত এটি বন্ধ করা প্রয়োজন। তা না হলে আগত বর্ষা মৌসুমেই নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দারা নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে মারাতœক ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। এছাড়া নানা ভাবে এ ক্ষতির প্রভাবও দৃশ্যমান হবে। তবে স্থানীয় প্রশাসন বলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে তারা অবগত নয়। জেলার ধলাই,ফানাই,জুড়ী নদীসহ স্থানীয় নদী,গাঙ্গ ও ছড়া থেকে এখন এমন অবৈধ বালু উত্তোলন হলেও হিড়িক পড়েছে মনুনদীতে। নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানান ক্ষমতাশীল দলের নেতাকর্মীরা নামে বে নামে শক্তিশালী সেলুপাম্প, বোমা মেশিন, বলগেট, বলহেট মেশিন দিয়ে উত্তোলন করছেন বালু। এরকারনে হুমকির মুখে পড়েছে নদীর জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও নদী তীরবর্তী এলাকা। ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট-মৌলভীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়ক ও নদী তীরবর্তী শতাধিক গ্রাম। প্রতিনিয়তই নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে বালু উত্তোলনের কারনে নদী গর্ভে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে একাধিক গ্রাম, ঘর-বাড়ি ও মৌলভীবাজার-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কসহ বেশ কয়েকটি গ্রামীণ সড়ক। মনুনদীর তীরবর্তী কুলাউড়া ,রাজনগর ও মৌলভীবাজার উপজেলার শতাধিক গ্রামের বাসিন্দাদের এমন অভিযোগ। তারা জানান প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুম এলেই এসকল বালু মহাল ইজারা নেওয়ার নামে নদী খেকোচক্র সক্রিয় হয়ে উঠে। তারা নানা ছোঁতায় একটি ঘাট ইজারা নিলে একাধিক ঘাট থেকে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করে। আবার অনেকেই দলীয় প্রভাবে কোন ইজারা ছাড়াই সম্পূন্ন বে আইনী ভাবে গায়ের জোরে বালু উত্তোলন করে। এরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বির”দ্ধে কথা বলার সাহস থাকেনা কারো। তারা বলেন ইজারার নির্দিষ্ট ঘাট ছাড়া অনান্য ঘাটে নিজেদের মত করে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলনের ফলে বর্ষা মৌসুমের শুর”তে ওই স্থান গুলোতেই ভাঙ্গনের মুখে পড়ে নদীর পাড়। আর ওই স্থান দিয়ে তীরবর্তী গ্রামগুলোতে পানি ঢুকে বানের পানিতে প্লাবিত হয় গ্রামের পর গ্রাম। তারা অভিযোগ করে বলেন ওদের এমন বেআইনী কর্মকান্ড বন্ধে প্রশাসনের নানা স্থানে দৌঁড়ঝাঁপ করেও কোন কাজ হয়না। রহস্যজনক কারনে ওদের বির”দ্ধে কোন আইনী পদক্ষেপ নেয় না স্থানীয় প্রশাসন। আর যারা বৈধ ভাবে ইজারা নিয়ে বালু তুলছেন তারও মানছেন না নিয়ম কানুন। জানা যায় মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ থাকলেও তা মানছেন না ইজারাদাররা। আইনের ৪নং ধারার (খ) তে বলা হয়েছে সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারেজ, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, বন, রেললাইন ও অন্যান্য গুর”ত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা অথবা আবাসিক এলাকার সর্বনি¤œ ১ কিলোমিটার দূর হতে বালু তুলতে হবে। কিন্তু মনুনদীতে এর কিছুই মানা হচ্ছে না। বালু তোলা নিয়ে চলছে হরিলুট। যে যার মতো করে যেখান থেকে ইচ্ছা সেই জায়গা থেকেই উত্তোলন করছেন বালু। জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখা থেকে জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলা থেকে সদর উপজেলার শেষ প্রান্ত শেরপুর পর্যন্ত মনুনদীর ২০টি স্থান বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা দেয়া হয়েছে। কিন্তু দেখা গেলে যে ঘাটটি ইজারা দেয়া হয়েছে সেখান থেকে বালু উত্তোলন না করে এর দু-পাশের কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও ইজারাদাররা প্রশাসনের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন। কিন্তু প্রশাসন দেখেও না দেখার বান করেছেন। এলাকাবাসী একাধিক অভিযোগ দিলেও বাস্তবে কোনো কাজ হচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে ওই প্রভাবশালী চক্র নানা ভাবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চালাচ্ছে এই অবৈধ কর্মযজ্ঞ। ওই নদীখেকোরা ক্ষমতাশীল দলের নেতাকর্মীর হওয়ায় ভয়ে কেউ মুখ খোলে কিছু বলতে ও প্রতিবাদ করতে পারছেন না। মনুনদীর ইজারাকৃত ২০টি স্থান কাদের কাছে দেয়া হয়েছে তথ্যটি জানতে জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখায় যোগাযোগ করা হলে সংশিষ্টরা জানালেন “স্যার বলেছেন পয়েন্টের নাম দেয়া যাবে তবে কার কাছে ইজারা দেয়া হয়েছে এটা বলা যাবে না”। সরেজমিন কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার উপজেলার মনুনদীর তীরবর্তী  বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেল দেদারছে চলছে বালু উত্তোলন। শ্রমিকদের কাছে ইজারাদারের খোঁজ নিলে তারা জানেন না বলে জানান। জানতে চাইলাম ঘাট ছাড়া অন্যস্থানে কেন বালু তোলা হচ্ছে। তারা জানালেন আমাদেরকে ওখান থেকে তুলতে বলা হয়েছে তাই। তখন ইজারাদারে নাম ও ঠিকানা চাইলে তারা জানেন না বলে জানান। এভাবেই একাধিক স্থানে শ্রমিকরা এ ভাবে প্রশ্নের পাশ কেটে  অবৈধ বালু উত্তোলনকারী নাম গোপন রাখার চেষ্ঠা করেন। অনেক স্থানে সাংবাদিকরা এসেছেন এই খবর পেয়ে শ্রমিকরা পালিয়ে যান। কয়েকজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন আমাদেরকে ইজারাদারের নাম ঠিকানা বলতে বারন করা হয়েছে। তারা জানালেন আসলে ওই স্থানগুলোর কোন ইজারা নেওয়া হয়নি। প্রভাব খাটিয়ে তাদের দিয়ে স্থানীয় কিছু লোকজন বালু তোলাচ্ছে। একই অবস্থা দেখা গেল মৌলভীবাজার-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দৌপাশা, তালরতল ও খেয়া ঘাটে এলাকায়। ওই স্থান থেকে শাহবন্দর পর্যন্ত মনুনদীর বাঁধের প্রায় ১ কিলোমিটারে কয়েকটি বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। যত দিন যাচ্ছে ওই ফাটলগুলো আরোও বড় হচ্ছে। এর একটু সামনে দুর্লবপুর বড়বাড়ি হতে কনকপুর পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার বাঁধেও ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে এবং আখাইকুড়া ইউনিয়নের নতুন ব্রীজের নিচ থেকে মেশিনের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে আখাইলকুড়া ইউনিয়ন কমপ্লেক্সের নব-নির্মিত ভবন ভরাট করা হচ্ছে। এছাড়াও হুমকির মুখে আছে, চাঁদনীঘাট, সাবিয়া, বলিয়ারভাগ, বালিকান্দি, ডেউপাশা, শ্রীরামপুর, শাহবন্দর, ধৌপাশা, দুর্লভপুর, মমর”জপুর, আশিয়া, কনকপুর, দলিয়া, গাঘুটিয়া, নলদাড়িয়া, দামিয়া, বাড়ন্তী, বেকামুড়া, সম্পাসী, থানাবাজার, ইসলামপুর, কামালপুর, মিরপুর, কাজিরবাজার, পাঠানটুলা, নাদামপুর, গোড়াখাল, সরকারবাজার, ফতেপুর, সাধুহাটি, শাহবাদ ও শেরপুর গ্রাম। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান প্রতিদিনই এসব এলাকায় খোলা ট্রাকে বালু পরিবহন করায় খালি চোখে রাস্তা দিয়ে হাটা চলাও ঝুঁকি হয়ে দাড়িয়েছে। তাছাড়া একই এলাকায় একাধিক স্থান থেকে অবাধে বালু তোলায় বর্ষা মৌসুমে নদীর প্রতিরক্ষা বাধ ভেঙ্গে নদী তীরবর্তী গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এবিষয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন বাপার মৌলভীবাজার জেলা স্বমন্বয়ক আ.স.ম ছালেহ সোহেল বলেন জেলার নদী ও ছড়া থেকে অবৈধ ও অপরিকল্পিত ভাবে বালু উত্তোলনে হুমকির মুখে এ অঞ্চলের জলজপ্রাণী ও জীববৈচিত্র। এ অবৈধ কর্মকান্ড বন্ধে প্রশাসন দ্র”ত পদক্ষেপ নেবে এমনটি প্রত্যাশা আমাদের। এবিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আলম খান বলেন, যারা বলগেট বা বলহেট মেশিন দিয়ে বালু তুলবে তাদের বির”দ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমনটি জেলা আইনশৃঙ্খলা সভায়ও সিন্ধান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা কয়েকটি মেশিনও জব্দ করেছি এবং অভিযান চালানোর জন্য প্রত্যেক উপজেলা ইউএনও ও পুলিশকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। এছাড়া জেলার কোথাও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

loading...
error: এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা আংশিক নকল করে বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি
%d bloggers like this: