কুদালী ছড়া স্বরুপে ফিরল : জলবদ্ধতা অনেকাংশেই কমবে

মার্চ ২৭, ২০১৮, ১:৫৮ অপরাহ্ণ 👉 এই সংবাদটি ৯৯ বার পড়া হয়েছে

Loading...

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা: মৌলভীবাজার শহরের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ কোদালীছড়া। একাধিকবার ছড়াটি পরিষ্কার পরিছন্ন ও খনন কাজ হলে স্থানীয়রা ময়লা-আবর্জনা ফেললে এটি ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাষেনে বাঁধা সৃষ্ঠি হচ্ছে। পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের সঠিক নজরদারী না থাকায় ছড়াটি বে-দখল ও সংকোচিত হয়ে বেহাল দশায়। ছড়াটি দেখতে ছোট হলেও কাজের চাপ নদীর মতই। কিন্তু তার কদর কিংবা যতœ নেই বিন্দু মাত্র। ছোট্ট ছড়াটির উপর বড় ধকল। বেদখল,নাব্য হ্রাস আর ময়লা আর্বজনায় ছড়াটির মূমুর্ষ অবস্থা। জন্ম থেকে না হলেও এখন যেন এমনটিই ছড়াটির নিয়তি। শুরু থেকে এখনো একাই সামাল দিতে হয় শহর ও গ্রাম। প্রতিনিয়ত এমন অযাচিত অত্যাচারের দৃশ্য চলমান।
জানা গেল ছড়াটি বর্ষিজোড়া পাহাড় থেকে শুরু হয়ে শহর ও গ্রাম দিয়ে বয়ে হাইল হাওরেই শেষ। নাব্য হ্রাস আর দু’তীরে অবৈদ দখল দ্বারিত্বে বিলীন হতে চলেছিল কুদালি ছড়া। প্রতিনিয়তই এমন জন উপদ্রবে এক সময়ের ¯্রােতস্বিনী কুদালী ছড়াটি হয়ে পড়ে মৃত্যুপথ যাত্রি। আর এ কারনেই বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় শহরবাসীদের অসহ্যনীয় দূর্ভোগ। ছড়াটির এমন আতœহনন রোধে উদ্যোগি হন মৌলভীবাজারের পৌর মেয়র।   পৌরসভার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় জেলা প্রশাসনও। তাদের যৌথ উদ্যোগে শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কুদালী ছড়া রক্ষায় নানা শ্রেণী পেশার মানুষকে নিয়ে হয় বৈঠক। জেলা প্রশাসকের হল রুমে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সম্মিলিত সিন্ধান্ত আসে ১০ ফেব্রুয়ারি স্বেচ্ছা শ্রমে কুদালী ছড়া খননের।
এমন সিদ্ধাতে অনুপ্রাণিত হন স্থানীয় বাসিন্দারা। সকলেই কোদালী ছড়া বাঁচাতে স্বেচ্ছা শ্রমে অংশ নিতে আগ্রহী হন। পরে এ সব দূরীকরণে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার উদ্যেগে স্বেচ্ছাশ্রমে পরিষ্কার পরিছন্ন ও খনন কাজ শুরু হয়। শুরুর প্রথম দিন পৌরসভার আওতাধীন প্রায় ৪ কিলোমিটার অংশে কুদালী ছড়া পরিস্কার পরিচ্ছন্নতায় স্বর্তস্ফুর্ত অংশ নেন সহ¯্রাধিক মানুষ।
জানা যায় কুদালী ছড়ার দৈর্ঘ হচ্ছে ১৭ কিলোমিটার। পৌরসভা ছাড়াও ৩টি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম দিয়েও প্রবাহিত হচ্ছে। সে কারনে ছড়াটি শহর বাসির জন্য যে শুধু জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজন এমনটি নয়। গ্রামের কৃষিজীবী মানুষেরও জীবনের অনুসঙ্গ। তাই ছড়াটি কৃষিজীবী মানুষের ধান ও মৌসুমী সবজি চাষের জন্য পানির অন্যতম উৎস। আর তার স্বচ্ছ মিঠা পানির জলাধার দেশীয় প্রজাতি মাছের নিরাপদ আবাসস্থল। গতকাল সরজমিনে সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষিজীবী জুনেদ আহমদ,সিরাজুল ইসলাম,শওকত আহমদসহ অনেকেরই সাথে আলাপে তারা জানালেন মৃতপ্রায় কুদালীছড়া আমাদের কৃষি ক্ষেতের জন্য ছিল অভিশাপ। নাব্য হ্রাসে আর বেদখলে বর্ষাকালে দীর্ঘ জলাবদ্ধতা। আর শুস্ক মৌসুমে মরুভূমি। তাই দু’ মৌসুমেই দু’তীরের ব্যাপক জমি থাকে অনাবাদি। আর আবাদ হলেও ভালো ফলন নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা।
সম্প্রতি কুদালী ছড়া খনন কাজ শুরু হওয়াতে আমরা আশান্বিত। ছড়াটির প্রাণ ফিরলে আমাদের মুখেও হাঁসি ফুটবে। তাদের প্রত্যাশা কুদালী ছড়া আগের মতই হবে গ্রাম ও শহর বাসীর আর্শিবাদ। তবে সে জন্য ভরাট হওয়া কুদালি ছড়ার পুরো ১৭ কিলোমিটারই খননের জোর দাবী তাদের। ছড়াটির উপকার ভোগী অনেকেই জানান আগে একাধীক বার কুদালী ছড়া খননের নাম করে প্রকল্পের পুরো টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এবারই প্রথম পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে খনন কাজ শুরু কারায় তারা আনন্দিত।
পৌরসভা সুত্রে জানা যায় কুদালী ছড়াকে আগের রুপে ফিরিয়ে নিতে বেশ কিছু পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে প্রথম ধাপটি তারা বেশ সফলতার সাথে সম্পন্ন করেছেন। প্রথম ধাপটি ছিল ছড়া রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করা। ২য় ধাপ হচ্ছে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ও খননকাজ। ৩য় ধাপ হল ছড়ার দু’পাশ চিহ্নিত করে তা রক্ষায় সংরক্ষণ প্রাচীর (গাইড ওয়াল) নির্মাণ করা। ৪র্থ ধাপে রয়েছে ছড়ার পাশ দিয়ে মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করে নিরাপদ পা হাটার পথ (ওয়াক ওয়ে) তৈরী করা। তাছাড়া স্থায়ী ভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি ছড়াটির দু’তীরের মানুষকে অনাবাদি কৃষিজমি চাষাবাদ,খাঁচায় মাছ চাষ ও হাঁস পালনের কর্মক্ষেত সৃষ্টি করে দেওয়া। ছড়াটির দু’পাশ রক্ষায় সংরক্ষণ প্রাচীর তৈরীর আগে পৌরসভা,পানিউন্নয়ন বোর্ড ও জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে জরিপ কাজ পরিচালিত হবে। ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি দল ওই জরিপ কাজ পরিচালনা করবে।
পৌরসভার প্রধান প্রকৌশলী মো: আবুল হোসেন খান বলেন আমরা সম্মানিত পৌর নাগরিকদের সহায়তায় পরিস্কার পরিচন্নতা শেষে এ পর্যন্ত পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে ২টি এক্ররেবেটরসহ আরো ৩-৪টি গাড়ি দিয়ে পৌরসভা আওতায় প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার খননের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই কাজ শেষ হলে অনান্য ধাপের কাজ শুরু হবে। তবে অনান্য কাজের ব্যয় সংকুলান পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে করা প্রায় দুস্কর। সে জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়টি জানিয়ে মেয়র মহোদয় যোগাযোগ করছেন। তাদের সাড়া পেলে শিগগিরই অবশিষ্ট অসম্পন্ন কাজ গুলো শুরু হবে।
মৌলভীবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ডা: এম এ আহাদ বলেন কুদালী ছড়া হচ্ছে মৌলভীবাজার শহরের প্রাণ। পুরো শহরের পানি নিস্কাসনের একমাত্র মাধ্যম। নানা কারনে ছড়াটি ধ্বংসের দ্বারপান্তে ছিল। পৌর মেয়র ছড়াটি বাঁচাতে যে উদ্দ্যোগ নিয়েছেন তা প্রশংসার দাবীদার। ছড়াটির দু’ পাড় রক্ষা করে তাতে দৃষ্টি নন্দন গাছ লাগানোরও পরামর্শ তার।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও প্রবীণ রাজনীতিবীদ এ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব বলেন কুদালী ছড়ার স্বচ্ছ পানিতে একসময় শহর ও গ্রামের সৌখিন মৎস্য শিকারীরা বর্ষি কিংবা ঝাল দিয়ে মাছ ধরতেন। ছোট ঘাসি কিংবা ডিঙ্গি নৌকায়ও লোকজন চলাচল করতেন। বর্ষা মৌসুমের শুরুতে কৈ মাগুর শিং আর বোয়াল মাছের উজাই ধরতেন স্থানীয়রা। এখন সে স্মৃতির বাস্তবতা নেই এই প্রজন্মের কাছে। এর অন্যতম কারন র্দীঘ সংস্কার হীনতায় ছড়াটি তার ঐতিহ্য হারিয়েছে। শহর সৌন্দর্য রক্ষায় ছড়াটির গুরুত্ব অপরিসীম। পৌরসভার এই প্রশংসনীয় উদ্যোগকে শহরবাসী কৃতজ্ঞচিত্রে স্বাগত জানাচ্ছেন।
প্রবীণ রাজনীতিবীদ দেওয়ান আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী বলেন শহরের পানি নিস্কাসনের একমাত্র ছড়াটি এখন আর আগের অবস্থায় নেই। তাই ছড়াটিকে বাঁচিয়ে শহরের জলাবদ্ধ নিরসনের যে সময় উপযোগী প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেজন্য পৌরসভার মেয়রকে নাগরীকদের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই।
জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নেছার আহমদ বলেন কুদালী ছড়া আর অভিশাপ নয়। এখন আর্শিবাদ। শহরবাসীসহ ছড়াটির দু’তীরের বাসিন্দাদের মুখে হাঁসি ফুটেছে। একটি উদ্যোগে যে সমাজ উপকারে বড় ভূমিকা রাখতে পারে তার অন্যতম উদাহরণ হল পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে কুদালী ছড়ার খনন কাজ।
বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী আরিফুল হক বলেন বিএডিসির ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গেল বছর সাড়ে ৫ কিলোমিটার ও চলতি বছরে ২ কিলোমিটার খনন কাজ শেষ হয়েছে। আরো ২ কিলোমিটার খনন কাজ শিগগিরই শুরু হবে। এই দু’কিলোমিটার খনন কাজ শেষ হলে ছড়াটি প্রাণ ফিরে পাবে।
পৌর মেয়র ফজলুর রহমান বলেন নাব্য হ্রাসে ছড়াটির অস্তিত্ব ছিল বিলীন হওয়ার পথে। শহরের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত একমাত্র ছড়াটির দু’পাশের অধিকাংশই দখল ও ভরাট হওয়ার কারনে একসময়ের স্বচ্ছ ও ¯্রােতস্বিনী ছড়াটির নেই সেই ঐতিহ্য। এ কারণে বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই শহরে বিভিন্ন পাড়া ও মহল্লাতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ছড়াটির এই দুর্দশা হতে মুক্ত করতে আমাদের এই প্রয়াস। শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন ও সৌন্দর্য বর্ধনে এই ছড়াটি নিয়ে আমরা নানা উদ্যোগ ও পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। সম্মানিত নাগরিকদেরও স্বর্তস্ফুর্ত সহযোগিতা পাচ্ছি। অনেকেই বাড়ির সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে জায়গা ছেড়ে দিয়ে আমাদেরকে সহযোগিতা করছেন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা আর সচেতনতায় কুদালী ছড়া তার হারানো সোনালী অতীত ফিরে পাবে।
জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম বলেন, এ বছর সচেতনতা বৃদ্ধি করতে স্বেচ্ছাশ্রমে কোদালী ছড়া খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পৌরসভা এলাকা ছাড়া বিএডিসি কুদালি ছড়ার বাকি অংশটুকুর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। খনন কাজ শেষ হলে দু’তীর রক্ষা করে তাতে গাছ লাগানো হবে এবং পা হাটার পথ তৈরী করা হবে।

loading...
error: এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা আংশিক নকল করে বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি